হটস্পট চিহ্নিত করে এডিস মশা নিধনে কাজ করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। তারপরও নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গুর বিস্তার। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ১০০টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২৯টি ওয়ার্ড রয়েছে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কও বেশি। মশকনিধন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞ ও নগরবাসী।
কানাডাপ্রবাসী আবু সুফিয়ান সাজু। মাত্র ২০ দিনের সফরে দেশে এসেছেন তিনি। কিন্তু দেশে আসার কয়েক দিনের মধ্যেই প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হন। রাজধানীর ডেঙ্গুর হটস্পট এলাকায় বাসা হওয়ায় বাড়তি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। তাই কানাডায় ফিরে বাকি চিকিৎসা নেয়ার পরিকল্পনা করছেন।
আবু সুফিয়ান সাজু বলেন, কানাডার পরিবেশ অনেক পরিচ্ছন্ন। সেখানে ঘরে কখনো পোকামাকড় বা মশা দেখেনি। কিন্তু দেশে আসার দুই-তিন দিনের মধ্যেই প্রচণ্ড জ্বর শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত ডেঙ্গু হয়ে থাকলেও এরইমধ্যে ছুটি শেষ হয়ে গেছে।
শুধু সাজু নন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যেও ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ নগরবাসী। কোথাও ঘরের কোণে, আবার কোথাও ফুলের টবের নিচে জমে থাকা পানিতে মিলছে এডিস মশার লার্ভা।
সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রমে মশার উপদ্রব কমছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে নগরবাসীর। তাদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর ঘরে বসে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। ধোঁয়া দেয়ার পর কিছু সময়ের জন্য মশা কমলেও পরে আবার ফিরে আসে।
হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের ঠিকানা বিশ্লেষণ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ১০০টি হটস্পট চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকার বড় অংশ মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও শ্যামলীতে। এ ছাড়া মহাখালী, বনানী, গুলশান, রামপুরা ও উত্তরা এলাকাও উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। এসব এলাকার বেশিরভাগই ধানমন্ডি, কলাবাগান, সেগুনবাগিচা, শাহবাগ, চকবাজার, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর ও ডেমরায়। ডিএনসিসির দাবি, হটস্পট চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়ায় ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ ফিভার ক্লিনিকের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর অংশ হিসেবে ৩১ অক্টোবর মিরপুরে ফিভার ক্লিনিক চালু করা হবে। কারও জ্বর হলে সেখানে প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মশার দৃশ্যমান প্রজননস্থলের পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রজননস্থলগুলোতেও লার্ভা ধ্বংস করতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, প্রতিটি প্রাণীই বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। মশার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। তুলনামূলক কম পরিষ্কার জায়গাতেও মশা ডিম পাড়তে পারে। তাই মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি মানুষের দায়িত্ববোধেরও ঘাটতি রয়েছে। নিজের বাড়িতে পানি জমে থাকলে তা সরিয়ে ফেলা প্রত্যেকের দায়িত্ব। কিন্তু অনেকেই সেই দায়িত্ব পালন করেন না।
ঝুঁকিমুক্ত রাজধানী গড়তে মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ চিহ্নিত অধিকাংশ হটস্পটেই মিলছে এডিস মশার লার্ভা। তাই শুধু হটস্পট চিহ্নিত করলেই হবে না, সেখানে লার্ভা ধ্বংসের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এসব উদ্যোগে নগরবাসীকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি উদ্যোগ ও জনসচেতনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।