বয়স বাড়লেই অনেকে নিয়ম করে স্বল্প মাত্রার অ্যাসপিরিন খাওয়া শুরু করেন। ধারণা, এতে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে। কিন্তু যাঁদের আগে কখনো হৃদ্রোগ, স্ট্রোক বা রক্তনালির জটিলতা হয়নি, তাঁদের জন্য প্রতিদিন অ্যাসপিরিন সেবন আদৌ প্রয়োজন কি না, এ নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুলভাবে অ্যাসপিরিন খেলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাও কম নয়।
একসময় হৃদ্রোগ প্রতিরোধে অ্যাসপিরিনকে প্রায় ‘ম্যাজিক ট্যাবলেট’ হিসেবে দেখা হতো। কারণ এই ওষুধ রক্ত পাতলা রাখতে সাহায্য করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমায়। ফলে যাঁদের আগে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা হার্টের ব্লকেজ হয়েছে, তাঁদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যাসপিরিন দীর্ঘদিন ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় “সেকেন্ডারি প্রিভেনশন” বা দ্বিতীয় ধাপের প্রতিরোধ।
তবে সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন সুস্থ মানুষও কেবল বয়সের কারণে নিজে থেকেই অ্যাসপিরিন খাওয়া শুরু করেন। সাম্প্রতিক গবেষণা ও আন্তর্জাতিক গাইডলাইন বলছে, যাঁদের আগে হৃদ্রোগ হয়নি এবং ঝুঁকি তুলনামূলক কম, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন অ্যাসপিরিন খাওয়ার সুফলের চেয়ে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাসপিরিন পাকস্থলীতে আলসার, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ এমনকি মস্তিষ্কে রক্তপাতের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, উচ্চ রক্তচাপের রোগী বা যাঁদের আগে গ্যাস্ট্রিক আলসারের ইতিহাস আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। তাই “বয়স হয়েছে, তাই অ্যাসপিরিন খাব”, এমন সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
ঢাকার হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যক্তিভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ একজন ব্যক্তির বয়স, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, কোলেস্টেরলের মাত্রা ও পারিবারিক ইতিহাস বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় অ্যাসপিরিন প্রয়োজন কি না।
চিকিৎসকেরা বলছেন, হার্ট ভালো রাখতে শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং নিয়মিত হাঁটা, ধূমপান বর্জন, ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং মানসিক চাপ কমানোই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার পরিবর্তন অ্যাসপিরিনের চেয়েও বেশি উপকার দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক কয়েকটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের আগে হৃদ্রোগ হয়নি, তাঁদের মধ্যে প্রতিদিন অ্যাসপিরিন সেবনে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি সামান্য কমলেও একই সঙ্গে মারাত্মক রক্তক্ষরণের আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য নির্দেশিকায় এখন আগের তুলনায় অনেক সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাসপিরিন কোনো সাধারণ ভিটামিন নয় যে ইচ্ছেমতো প্রতিদিন খাওয়া যাবে। হৃদ্রোগ প্রতিরোধে এটি কার্যকর হলেও সঠিক রোগী নির্বাচনই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।