তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার উত্তেজনা এখন আর কেবল হুমকি-ধমকিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ‘অচলাবস্থার’দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘এক্সিওস’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, অদূর ভবিষ্যতে কোনো যুদ্ধ বা কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়াই এক অস্থির স্থবিরতায় জড়িয়ে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে জটিল। এক্সিওস-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরান; উভয় পক্ষই এখন এমন এক অবস্থানে যেখানে কেউ কাউকে এক চুল ছাড় দিতে রাজি নয়। সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সমাধান কিংবা আলোচনার টেবিলে বসে সমঝোতা; কোনো পথই এখন আর সহজ মনে হচ্ছে না।
প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। বিশেষ করে নির্বাচনী বছরে এমন এক অনিষ্পন্ন সংকট ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিতে পারে।
সামরিক বা কূটনৈতিক সমাধানের আশা ক্ষীণ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে এখন এক ভিন্নধর্মী কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের স্পর্শকাতর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের বিশাল সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হবে। শুধু তা-ই নয়, ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে নৌ-অবরোধ বা সমুদ্রপথে কড়া নজরদারি চালিয়ে যাওয়া ছাড়া ওয়াশিংটনের হাতে আর কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।
এই পরিস্থিতিকে বিশেষজ্ঞরা ‘স্নায়ুযুদ্ধের আধুনিক সংস্করণ’ হিসেবে দেখছেন। এখানে সরাসরি ট্যাঙ্ক বা ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াইয়ের চেয়ে ‘কে আগে ধৈর্য হারাবে’—সেই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই-ই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরান ও ওয়াশিংটন দুই পক্ষই এখন ওত পেতে বসে আছে প্রতিপক্ষের সামান্যতম ভুল বা দুর্বলতা খুঁজে পেতে।
এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, এই ‘অপেক্ষা করার খেলা’ কতদিন চলবে? ইরান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত হলেও তাদের কৌশলগত অবস্থানে অনড়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে বিনা যুদ্ধে ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী এই স্থবিরতা উল্টো মার্কিন অর্থনীতি এবং ওই অঞ্চলের মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করতে পারে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত কয়েক দফার যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনার টেবিল পেরিয়ে পরিস্থিতি এখন দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা ও নৌ-অবরোধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। মূলত মধ্যস্থতা আর কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ চললেও তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার আস্থার সংকট দূর না হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে।
ফেব্রুয়ারির শেষলগ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান ইরানের ভূখণ্ডে বড় ধরনের আঘাত হানে। প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই উত্তেজনার পর, গত ৭ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেকটা আকস্মিকভাবেই তেহরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের একটি 'পারস্পরিক যুদ্ধবিরতি' ঘোষণা করেন। এই উদ্যোগের ফলশ্রুতিতে ৮ এপ্রিল থেকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সংঘাত সাময়িকভাবে বন্ধ হয়।
১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে উভয় দেশের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি সংলাপে বসলেও তা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আনতে ব্যর্থ হয়। বিভিন্ন বিষয়ে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে আলোচনা ভেস্তে গেলে ১৩ এপ্রিল ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইরানের 'হরমুজ প্রণালি' ঘিরে মার্কিন নৌবাহিনী অবরোধ আরোপ করে, যা মূলত ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ২১ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুনরায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও তেহরান তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ওয়াশিংটনের একতরফা সিদ্ধান্ত মানার কোনো বাধ্যবাধকতা তাদের নেই। বরং জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে।