মাসের নির্দিষ্ট সময়ে হঠাৎ দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা বা মানসিক চাপ বাড়ার অভিজ্ঞতা অনেক নারীরই পরিচিত। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাসিক চক্রের শেষ পর্যায়ে হরমোনের পরিবর্তনই এর মূল কারণ, যা মস্তিষ্কের মুড নিয়ন্ত্রণে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
নারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে মাসিক চক্রের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষজ্ঞরা আরও জোর দিচ্ছেন এই চক্রের মানসিক প্রভাবের ওপর। অনেক নারীই জানান, মাসিক শুরুর আগের কয়েকদিন তারা অকারণ দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা, এমনকি হালকা বিষণ্নতায় ভোগেন। বিষয়টি কেবল মানসিক নয়, এর পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট জৈবিক কারণ।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় মাসিক চক্র চারটি ধাপে বিভক্ত- মেনস্ট্রুয়াল, ফোলিকুলার, ওভুলেটরি এবং লুটিয়াল ফেজ। এর মধ্যে লেট লুটিয়াল ফেজ, অর্থাৎ মাসিক শুরুর প্রায় ৭ থেকে ১০ দিন আগে, মানসিক অস্থিরতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা হঠাৎ কমে যায়, যা মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আনে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হরমোনগত পরিবর্তনের ফলে সেরোটোনিন নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যকারিতা কমে যায়। সেরোটোনিন আমাদের মুড, ঘুম ও মানসিক স্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মাত্রা কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ, বিরক্তি বা অস্বস্তি বাড়তে পারে।
ঢাকার এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, “এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। তবে অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম (PMS) বা প্রিমেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার (PMDD)-এর রূপ নিতে পারে, যেখানে লক্ষণগুলো আরও তীব্র হয়।”
এই সময়টিতে নারীদের আচরণগত পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যায়। ছোটখাটো বিষয়েও অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া, মনোযোগের ঘাটতি, ঘুমের সমস্যা বা ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার বা কর্মক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ে, যা সম্পর্কের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবর্তনগুলোকে নেতিবাচকভাবে দেখার কিছু নেই। বরং এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক সংকেত, যা বুঝে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং মানসিক চাপ কমানোর কৌশল—এসবই এই সময়ের উদ্বেগ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
এছাড়া, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় কাউন্সেলিং বা ওষুধের মাধ্যমে এই সমস্যা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সচেতনতা এবং খোলামেলা আলোচনা এই বিষয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও ইতিবাচক করতে পারে।