সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার যে প্রবণতা দেখা দিয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) তা আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক বিশ্লেষণ বলছে, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সবজির বাজারে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিই মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ আরও তীব্র হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের প্রকাশিত ‘ইনফ্লেশন ডাইনামিকস ইন বাংলাদেশ: এপ্রিল-জুন ২০২৬’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচ্য প্রান্তিকে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২১ শতাংশ, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। এ সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং কোর মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে জ্বালানি খাত। জ্বালানি মূল্যস্ফীতি ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষ করে গ্যাসের মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৪ শতাংশ এবং জ্বালানি তেল ও লুব্রিক্যান্টের মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের প্রভাবই এ বৃদ্ধির মূল কারণ।
খাদ্যপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করেছে সবজির বাজার। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে সবজির অবদান আগের প্রান্তিকের ২২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৭ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে সামগ্রিক খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও ডালের মতো আমিষজাতীয় পণ্যের অবদান এখনও সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৪৬ শতাংশ। অন্যদিকে চাল, ভোজ্যতেল, মসলা ও রান্নার অন্যান্য উপকরণের মূল্যচাপ কিছুটা কমেছে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতেও খাদ্যপণ্যের দাম উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। অধিকাংশ সবজির কেজি ১০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচের দাম ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। পাশাপাশি দেশি পেঁয়াজ, ডিম এবং পাঙাশ, তেলাপিয়া, রুই, পাবদা, চিংড়ি ও দেশি কইসহ বিভিন্ন মাছের দামও বেড়েছে। মাংসের বাজারেও উচ্চমূল্যের ধারা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মূল্যচাপ শুধু খাদ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পরিবহন ও যোগাযোগসেবা, বিশেষ করে ইন্টারনেট ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত পরিচর্যা খাতেও ব্যয় বেড়েছে, যা কোর মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
আইএনএমের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে. মুজেরীর মতে, মূল্যস্ফীতির পেছনে মৌসুমি ও কাঠামোগত—দুই ধরনের কারণই কাজ করছে। গ্যাস সরবরাহ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বন্যা ও আকস্মিক বন্যায় কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়েছে। তার মতে, শুধু নীতিসুদ বাড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, বাজার তদারকি জোরদার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিফিউশন ইনডেক্স বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুন মাসে ভোক্তা মূল্যসূচকের ৩৮২টি পণ্যের মধ্যে ২৬১টির দাম বেড়েছে, কমেছে মাত্র ২২টির এবং ৯৯টি পণ্যের দাম অপরিবর্তিত ছিল। এতে বোঝা যায়, মূল্যবৃদ্ধি এখন আর নির্দিষ্ট কয়েকটি পণ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং অর্থনীতির বিস্তৃত অংশে ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে এলেও তা এখনও স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোগব্যয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতির ফলে ঋণের সুদহার বেড়ে বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যদিও সম্প্রতি নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করা হয়েছে, তবুও অর্থনীতিবিদদের মতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজার ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি প্রাপ্যতা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির সমন্বিত বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে কার্যকর পথ।