যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে তেহরানের বিপুল বৈদেশিক সম্পদ বিভিন্ন দেশে জব্দ হয়ে আছে। তেল বিক্রির আয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভসহ এই অর্থ এখন যুদ্ধবিরতি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, যা মুক্তি পেলে ইরানের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্ব শুধু সামরিক উত্তেজনাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। এসব নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের শত শত বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সম্পদ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আটকে আছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগে এই অর্থের মুক্তিই এখন অন্যতম কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জব্দ হয়ে থাকা অর্থ মূলত তেল রপ্তানির আয়, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে এসেছে। এই সম্পদের বড় অংশ জমা রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, ইরাক, জাপান ও কিছু ইউরোপীয় দেশে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এই অর্থ সরাসরি ব্যবহার করতে পারে না তেহরান।
বিশেষ করে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) থেকে সরে গিয়ে পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ফলে ইরানের তেল বিক্রির অর্থ বিদেশি ব্যাংকে আটকে পড়ে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও এই অর্থ ব্যবহারে জটিলতা দেখা দেয়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার ইরানি সম্পদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। একইভাবে ইরাকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস বাণিজ্যের বিপরীতে ইরানের প্রাপ্য অর্থও পুরোপুরি ছাড় করা হয়নি। এসব অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন প্রয়োজন হয়, যা রাজনৈতিক দরকষাকষির একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বিপুল অর্থ মুক্তি পেলে ইরানের অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশটির মুদ্রাস্ফীতি কমতে পারে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে এবং আমদানি ব্যয় মেটানো সহজ হবে। একই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে।
তবে এই অর্থ মুক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক শর্তও জড়িয়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চাইছে, ইরান যেন তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করে এবং আঞ্চলিক সামরিক কার্যক্রমে সংযম দেখায়। অন্যদিকে, তেহরান বলছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ছাড়া কোনো বড় ধরনের সমঝোতা সম্ভব নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই জব্দ সম্পদ শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং একটি কৌশলগত চাপের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করছে। কূটনৈতিক আলোচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘লিভারেজ’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা দুই পক্ষের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ইরানের জব্দ হয়ে থাকা সম্পদ এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই অর্থের মুক্তি বা আটকে থাকা দুইই ভবিষ্যতের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।