দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিনিয়োগ খাতেও। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় নতুন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিনিয়োগ উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি অবকাঠামো, প্রশাসনিক জটিলতা ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও বিনিয়োগের পথে বাধা তৈরি করছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে।
গত কয়েক বছর ধরে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে বছরে গড়ে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। একই সময়ে কম্বোডিয়ায় এর পরিমাণ ছিল দ্বিগুণেরও বেশি। আর ভিয়েতনামে বছরে গড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে।
সম্প্রতি জেনেভায় জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট একটি বৈঠকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সেখানে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। তবে সমন্বিত বিনিয়োগ নীতি, আইন, ডিজিটাল অনুমোদন ব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগের কথাও উঠে আসে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন করে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাবের পাইপলাইন তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে। চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু এবং চীনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ কার্যালয় স্থাপনের পর আরও বড় পরিসরে বিনিয়োগ প্রস্তাব আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বিভিন্ন সংকটের কারণে সম্ভাব্য বিনিয়োগের বড় অংশ এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিসও পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। পাশাপাশি কয়েকটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এ জন্য স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে শুধু নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা দিলেই হবে না। প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও দুর্নীতি কমানোর পাশাপাশি শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক, পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ বছরের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি বর্তমানে সবচেয়ে কম। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের ঋণ গ্রহণের হারও গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।