মানবজাতির মহাকাশ অভিযানের দীর্ঘ ইতিহাসে আবারও যুক্ত হলো এক নতুন আলোকোজ্জ্বল অধ্যায়। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর মানুষকে নিয়ে চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরেছে নাসার আর্টেমিস-২ অভিযান। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ওরিয়ন মহাকাশযানের অবতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ১০ দিনের সেই দুঃসাহসিক যাত্রা, যা শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়—মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ মহাকাশ স্বপ্নেরও এক প্রতীকী ঘোষণা।
বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোরে ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে পানিতে স্পর্শ করে ওরিয়ন। ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর এই প্রথম কোনো মানববাহী মহাকাশযান চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে এল।
আগুনের দেয়াল ভেদ করে প্রত্যাবর্তন
পৃথিবীতে ফেরা কখনোই শুধু ফেরত আসা নয়—এটি মহাকাশযানের জন্য আগুনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সমান। ঘণ্টায় প্রায় ২৫ হাজার মাইল বেগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ওরিয়নের বাইরের তাপমাত্রা পৌঁছে যায় প্রায় ২ হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
জ্বলন্ত অগ্নিগোলকের মতো ছুটে আসা ক্যাপসুলকে ঘিরে তৈরি হয় উত্তপ্ত প্লাজমার স্তর, যার কারণে কিছু সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে নভোচারীরা। উৎকণ্ঠায় থমকে যায় হিউস্টনের নিয়ন্ত্রণকক্ষ।
তারপরই ভেসে আসে কমান্ডার রেইড ওয়াইজম্যানের কণ্ঠ-
“হিউস্টন, আমরা আপনাদের শুনতে পাচ্ছি।”
এক মুহূর্তেই স্বস্তির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে নিয়ন্ত্রণকক্ষে।
সমুদ্র যেন দেয়াল
অবতরণের শেষ ধাপেও ছিল ভয়াবহতা। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১১ মাইল ওপরে খুলতে শুরু করে ওরিয়নের ১১টি প্যারাসুট। বিশাল তিনটি প্রধান প্যারাসুট পুরোপুরি প্রসারিত হওয়ার পর মহাকাশযানের গতি ঘণ্টায় ৩২৫ মাইল থেকে কমে আসে মাত্র ১৭ মাইলে।
তারপর প্রশান্ত মহাসাগরের জলে আঘাত। কিন্তু উচ্চগতির মহাকাশযানের জন্য পানি তখন নরম তরল নয়—প্রায় কংক্রিটের দেয়ালের মতো শক্ত। প্রচণ্ড ধাক্কায় কেঁপে ওঠে ক্যাপসুল। খুলে যায় নিচের পাঁচটি কমলা এয়ারব্যাগ, উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে ওরিয়নকে সোজা ও স্থিতিশীল রাখতে।
সমুদ্রের বুকে পুনর্জন্ম
অবতরণস্থলের পাশে অপেক্ষায় ছিল মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ জন পি মুর্থা। ডুবুরিরা দ্রুত ক্যাপসুল ঘিরে নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন করেন।
দরজা খুলতেই বহুদিন পর পৃথিবীর নোনা বাতাস মুখে লাগে নভোচারীদের। ওজনহীনতার ১০ দিন শেষে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণে প্রতিটি পদক্ষেপই যেন নতুন অনুভূতি। একে একে চারজনকে হেলিকপ্টারে করে যুদ্ধজাহাজে তোলা হয়। চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন—সবাই সুস্থ, স্থিতিশীল, স্বাভাবিক।
হাজার ৭৫৬ মাইল দূরে পৌঁছান—যা অ্যাপোলো-১৩–এর পুরোনো রেকর্ড ভেঙে মানববাহী মহাকাশযাত্রার নতুন মাইলফলক গড়েছে।
চাঁদে যাওয়া ও ফিরে আসা মিলিয়ে মোট ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৪৮১ মাইল পথ অতিক্রম করেছে আর্টেমিস-২। এটিই এখন মানব ইতিহাসের দীর্ঘতম চন্দ্রাভিযান।
নতুন ইতিহাস গড়া চার মুখ
এই অভিযানের চার সদস্য শুধু নভোচারী নন, তারা প্রত্যেকেই ইতিহাসের অংশ।
রেইড ওয়াইজম্যানের নেতৃত্বে মিশনে ছিলেন ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ ও কানাডার জেরেমি হ্যানসেন।
এই অভিযানের মাধ্যমে
প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে চাঁদের পথে গেছেন ভিক্টর গ্লোভার,
প্রথম নারী হিসেবে চন্দ্রকক্ষপথে পৌঁছেছেন ক্রিস্টিনা কোচ,
আর প্রথম অ-মার্কিন নভোচারী হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন জেরেমি হ্যানসেন।
মহাকাশ প্রতিযোগিতার নতুন বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, আর্টেমিস-২ শুধু বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়—এটি ভূরাজনীতিরও প্রতীক। নতুন শতকের মহাকাশ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র যে এখনও নেতৃত্বে, সেই বার্তাই বহন করছে এই অভিযান।
নাসা ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, এই সাফল্য ২০২৮ সালের মধ্যে মানুষকে আবার চাঁদের মাটিতে নামানোর পথকে বাস্তবসম্মত করে তুলেছে। লক্ষ্য—শুধু যাওয়া নয়, স্থায়ীভাবে থাকা।
মহাকাশের পথে মানবতার নতুন স্বপ্ন
নাসা প্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যানের ভাষায়,
“এটি কেবল শুরু।”
সত্যিই, আর্টেমিস-২ শুধু চার নভোচারীর পৃথিবীতে ফেরা নয়—এটি মানবজাতির চাঁদে ফেরার ঘোষণা, আরও দূরে যাওয়ার অঙ্গীকার, এবং মহাকাশকে নতুন করে নিজের সীমান্ত ভাবার সাহস।