দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ। ২০ আগস্টের নির্বাচনে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হওয়ার লড়াইয়ে রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, যাচাই-বাছাই শেষে দুজনের মনোনয়ন বৈধ হয় এবং কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় এবার ভোটে মুখোমুখি হচ্ছেন তাঁরা।
রাষ্ট্রপতি পদে দুজনের লড়াই শুধু দুই ব্যক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের দুই বড় রাজনৈতিক শিবিরের অবস্থানও। একদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমদ। সংসদে আসনসংখ্যার হিসাবে অবশ্য ফখরুল অনেক এগিয়ে। বর্তমান সংসদে বিএনপি ও তাদের মিত্রদের বিপরীতে ১১ দলীয় জোটের আসনসংখ্যা অনেক কম হওয়ায় ফখরুলের জয়কে প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তবে অলি আহমদের প্রার্থিতা নির্বাচনটিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার পর পরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০১১ সালে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বে আসেন তিনি।
বর্তমানে তিনি বিএনপির মহাসচিবের পাশাপাশি সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। ১৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।
ফখরুলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি তাঁর দীর্ঘ দলীয় অভিজ্ঞতা, সংসদীয় রাজনীতিতে পরিচিতি এবং বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থা। রাষ্ট্রপতি পদে তাঁকে প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে বিএনপি দলের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতাকে সাংবিধানিক পদে বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম
অন্যদিকে অলি আহমদের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধ ও সামরিক জীবনের ইতিহাস। তিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি কর্মকর্তা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। জেড ফোর্সের অধীনে যুদ্ধ করেন এবং বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে বীর বিক্রম খেতাব পান।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে রাজনীতিতে যোগ দেন অলি আহমদ। তিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে দীর্ঘদিন রাজনীতি করেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন।
২০০৬ সালে বিএনপি থেকে বের হয়ে তিনি এলডিপি গঠন করেন এবং দলটির চেয়ারম্যান হন। বর্তমানে তিনি এলডিপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করেছে।
১১ দলীয় জোটের নেতারা অলি আহমদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার বিষয়টি সামনে এনেছেন। জোটের নেতাদের ভাষ্য, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হিসেবে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারেন।
কোথায় পার্থক্য
দুই প্রার্থীর রাজনৈতিক পথের সবচেয়ে বড় পার্থক্য তাঁদের পেশাগত ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ধরনে। মির্জা ফখরুলের পরিচয়ের মূল জায়গা দীর্ঘদিনের দলীয় ও সংসদীয় রাজনীতি। অন্যদিকে অলি আহমদের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামরিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধ, মন্ত্রিত্ব এবং দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতা।
ফখরুল বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলের সাংগঠনিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ। অলি আহমদ বর্তমানে বিএনপির বাইরে থাকা একটি দলের নেতা এবং এবার বিএনপির নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শক্তির বিপরীতে অবস্থান নেওয়া ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী।
দুজনের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যেও বড় পার্থক্য রয়েছে। ফখরুল ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী। অলি আহমদ বিরোধী জোটের প্রার্থী। ফলে এই নির্বাচন একদিকে যেমন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, অন্যদিকে সংসদের ভেতরে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের একটি প্রতীকী প্রতিদ্বন্দ্বিতাও।
কে কতটা এগিয়ে
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন সংসদ সদস্যরা। ফলে সাধারণ মানুষের সরাসরি ভোটে এই নির্বাচন হচ্ছে না। বর্তমান সংসদে বিএনপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংখ্যার হিসাবে মির্জা ফখরুলই স্পষ্টভাবে এগিয়ে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি ও তার মিত্রদের হাতে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন রয়েছে। বিপরীতে ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্য সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
তবে অলি আহমদের প্রার্থিতা নির্বাচনের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে। কারণ টানা কয়েকটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় ভোটের প্রয়োজন হয়নি। এবার ৩৫ বছর পর আবারও সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।
এবারের নির্বাচনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভোটের স্বচ্ছতা। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোট হবে প্রকাশ্য পদ্ধতিতে; অর্থাৎ কোন সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা জানা সম্ভব হবে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থী ফখরুলের পক্ষে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি বিরোধী প্রার্থী অলি আহমদের পক্ষে কতজন সংসদ সদস্য ভোট দেন, সেটিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, সংখ্যার হিসাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এগিয়ে থাকলেও অলি আহমদের প্রার্থিতা এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে পরিণত করেছে। একজন ক্ষমতাসীন দলের অভিজ্ঞ রাজনৈতিক সংগঠক, অন্যজন মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও দীর্ঘদিনের রাজনীতিক। ২০ আগস্টের ভোটে ফলাফল অনেকটাই অনুমেয় হলেও দুই প্রার্থীর পক্ষে-বিপক্ষে ভোটের হিসাবটি দেশের রাজনীতিতে আলাদা তাৎপর্য বহন করবে।