খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার সালে প্রাচীন ব্যাবিলনে নতুন বছর শুরু হতো নতুন চাঁদ দেখা সাপেক্ষে। পহেলা বৈশাখ বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাসের প্রথম দিন, তাই এটি বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামে নববর্ষ উৎসব আমেজে পালন করা হয়।
মজার ব্যাপার হলো, আগে কৃষকদের মধ্যে ’ফসলি সন’ হিসেবে প্রচলিত আজকের বাংলা সন শুরু হতো অগ্রহায়ন মাস থেকে। পহেলা অগ্রহায়ণ ছিল নববর্ষ। অগ্রাহয়নে কৃষকরা মাঠের ফসল গোলায় তুলে অভাব-অনটন ভুলে একই সঙ্গে নববর্ষ ও নবান্নের উৎসবে মেতে ওঠতো। কৃষকদের সেই ফসলি সনকে নতুন করে বিন্যস্ত করেন মোঘল সম্রাট আকবর।
ঐতিহাসিকদের মতে, আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা হলো একটি নতুন হিসাব বই। এটা বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া।
পহেলা বৈশাখ গ্রামীণ সমাজে চৈত্রসংক্রান্তি ও বৈশাখী মেলার মাধ্যমে পালন করা হলেও একশ বছর আগে এই উৎসব ছিল নগরজীবনে অনুপস্থিত। কলকাতা ও ঢাকায় আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। এরপর বিচ্ছিন্নভাবে পহেলা বৈশাখ পালন করা হলেও তা নগরজীবনে কিছুটা ব্যাপকতা পায় ষাটের দশকে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি বিমাতসুলভ আচরণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে। তারই প্রতিবাদে ঢাকায় সংস্কৃতিকর্মীর সীমিত পরিসরে রমনা পার্কে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু করে। ১৯৬৭ সাল ছায়ানট যুক্ত হয় এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সঙ্গে। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের পরিধিও বেড়ে যায়। স্বাধীনতার পর তা আরো ব্যাপকতা পায়। নব্বই দশকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শেষে সেনাশাসনের অবসানের পর বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়তে থাকে। এভাবেই পহেলা বৈশাখ আজকের সার্বজনীন রূপ লাভ করেছে।