ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় ওষুধের পাশাপাশি পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ ও পূর্ণ বিশ্রামকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। জ্বরের সময় শরীরে পানিশূন্যতা ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। তাই পানি, ডাবের পানি, ওরস্যালাইন, ফলের জুসসহ বিভিন্ন তরল খাবার নিয়মিত খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ডেঙ্গুতে শরীরে তরলের ঘাটতি হলে রক্তচাপ কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ কারণে রোগীকে অল্প অল্প করে বারবার তরল খাবার দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত বিশ্রাম শরীরের শক্তি পুনরুদ্ধার এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কার্যকর রাখতে সহায়তা করে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল কাদের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর জন্য শুধু তরল খাবার নয়, পুষ্টিকর খাবারও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বরের কারণে পানিশূন্যতা, দুর্বলতা ও ক্লান্তির পাশাপাশি অনেক রোগীর রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা কমে যেতে পারে। এ সময় খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মাছ, মাংস, ডাল, ডিম, বাদাম, দুধ ও দই রোগীর খাবারের তালিকায় রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি পানি, ডাবের পানি, ওরস্যালাইন, ফলের জুস, দই বা লাচ্ছি নিয়মিত খাওয়ানো উপকারী। চিকেন স্যুপ, বাদাম, মিল্ক শেক ও পুডিংয়ের মতো সহজপাচ্য খাবারও দেওয়া যেতে পারে।
ডা. আব্দুল কাদেরের মতে, জ্বরের সময় অনেক রোগীর ভারী খাবার খাওয়ার ইচ্ছা বা সক্ষমতা থাকে না। তাই একবারে বেশি খাবার না দিয়ে অল্প পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার বারবার খাওয়ানো ভালো। এতে শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ অব্যাহত থাকে।
ডেঙ্গু রোগীর খাদ্যতালিকায় ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি। লেবু, কমলা, মাল্টা, আমলকী, জলপাই, জাম্বুরা ও আনারসের মতো ফল খাওয়া যেতে পারে। ভিটামিন-সি শরীরে আয়রন শোষণে সহায়তা করার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
ডেঙ্গুর জ্বর নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান হাফিজুর রহমান বাসসকে বলেন, ডেঙ্গুতে শরীরের তাপমাত্রা ১০২ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। এ সময় মাথায় পানি দেওয়া ও শরীর মুছে দেওয়ার মাধ্যমে জ্বর কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।
তিনি জানান, জ্বরের তীব্রতা অনুযায়ী ছয় থেকে আট ঘণ্টা পরপর প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ দেওয়া যেতে পারে। তবে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শরীরে পর্যাপ্ত তরল বজায় রাখা। পানি ছাড়াও ফলের রস, স্যুপ, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি ও শরবত খাওয়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
ডা. হাসান হাফিজুর রহমান রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার ওপরও জোর দেন। তাঁর ভাষ্য, ভাইরাল জ্বরে শরীরকে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার সুযোগ দিতে বিশ্রাম প্রয়োজন। তাই বিশ্রামের সময় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, অনলাইন গেম খেলা কিংবা অপ্রয়োজনীয় ইন্টারনেট ব্যবহারে সময় না দিয়ে শরীরকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৯ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৯ হাজার ৩৪৫ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ৬১ জন। মৃতদের মধ্যে ২২ জন পুরুষ এবং ৩৯ জন নারী।
এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের ৬১ দশমিক ৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ নারী। আক্রান্তদের মধ্যে শূন্য থেকে ৩৫ বছর বয়সী রয়েছেন ১০ হাজার ৩২ জন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগেই ডেঙ্গুতে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি।