আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনাটি নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে একটি বিস্তৃত ও সংগঠিত মানবপাচার চক্রের ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। বেঁচে ফেরা যাত্রীদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে, এই যাত্রা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি সুপরিকল্পিত নেটওয়ার্কের অংশ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার উপকূল এবং রোহিঙ্গা শিবির ঘিরে সক্রিয় দালালরা বিভিন্নভাবে মানুষ সংগ্রহ করে অবৈধভাবে সাগরপথে পাঠায়। উদ্ধার হওয়া নয়জনের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশিকে ইতোমধ্যে পাচারচক্রের সদস্য হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে কয়েকজনের ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হওয়ার ইঙ্গিতও মিলেছে।
বেঁচে ফেরা একাধিক যাত্রীর বয়ানে উঠে এসেছে, দালালরা কাজের প্রলোভন দেখিয়ে বা উন্নত জীবনের আশ্বাস দিয়ে মানুষকে ফাঁদে ফেলে। কুতুপালং ক্যাম্পের এক বাসিন্দা জানান, ‘মাহ নূর’ নামে এক ব্যক্তি তাকে বিদেশে কাজের কথা বলে ট্রলারে তোলে এবং পরে তার পরিবার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করে।
স্থানীয় সূত্রেও মিলেছে একই ধরনের অভিযোগ। কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে একাধিক তরুণ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারগুলো সরাসরি দালালদের দায়ী করছে।
ট্রলারটির ভেতরের চিত্র ছিল আরও ভয়াবহ। যাত্রীরা জানান, প্রায় ২৮০ জনকে গাদাগাদি করে তোলা হয় এবং সাগরে পৌঁছানোর পর অনেককে জোর করে ছোট কুঠুরিতে আটকে রাখা হয়। সেখানে শ্বাস নেওয়ার মতো পরিবেশও ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জনের মৃত্যু ঘটে বলে দাবি তাদের।
শেষ পর্যন্ত উত্তাল সাগরে ট্রলারটি ডুবে গেলে অনেকেই প্রাণ হারান। কেউ কেউ ভেসে থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরেন।
এদিকে, এই দুর্ঘটনায় প্রায় ২৫০ জন এখনো নিখোঁজ বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে তাদের কোনো নির্দিষ্ট তালিকা এখনো তৈরি হয়নি। অধিকাংশ পরিবারের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়নি, যা তদন্তকে আরও জটিল করে তুলছে।
কোস্ট গার্ডের করা মামলায় ইতোমধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে পুরো চক্র সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের পাচার অনেক ক্ষেত্রে ‘স্বেচ্ছা’ মনে হলেও এর পেছনে কাজ করে হতাশা, দারিদ্র্য এবং রাষ্ট্রহীনতার কঠিন বাস্তবতা। সেই দুর্বলতাকেই কাজে লাগিয়ে দালালচক্র মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুঝুঁকির মুখে।