হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় ফের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে জাহাজটির একজন নাবিক আহত হয়েছেন। হামলায় জাহাজের ইঞ্জিনকক্ষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার সমঝোতার সময়সীমা শেষ হওয়ার পরপরই এ ঘটনা ঘটল।
মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানায়, হরমুজ প্রণালিতে একটি নিক্ষিপ্ত বস্তুর আঘাতে জাহাজটির ইঞ্জিনকক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে জাহাজের নাবিকদের সহায়তায় এগিয়ে আসে ওমানের কোস্ট গার্ড।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে এর আগেই কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছিল ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, এই জলপথ দিয়ে যেসব জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করবে, তাদের জাহাজের কাঠামোয় ‘বেশ কয়েকটি সুন্দর ছিদ্র’ তৈরি হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার সমঝোতার মেয়াদ সোমবার শেষ হয়েছে। নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা ছাড়াই সময়সীমা শেষ হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার বলেছেন, তিনি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহী নন। তাঁর ভাষ্য, ইরান এমন কোনো চুক্তিতে রাজি হবে না, যা যুদ্ধ শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে দীর্ঘ সময় অনড় থাকতে পারে। ফলে দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনাও কমেছে। তাদের নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মধ্যে শান্তিচুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই; উত্তেজনা কমাতে বছরের শেষ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
এর প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনেও। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। কিন্তু ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠায় বিক্ষিপ্ত হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, রোববার মাত্র তিনটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। বিকল্প পথে তেল পরিবহন এবং বিশ্ব অর্থনীতির সাময়িক মানিয়ে নেওয়ার কারণে এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে ওঠেনি।
হরমুজের পাশাপাশি আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল কমেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহান্তে এই জলপথ দিয়ে ৪৯টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। আগের সপ্তাহে এ সংখ্যা ছিল ৫৫টি।
বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ৬০ দিনের সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারেও।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহের দাম ০.২৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৪.৭০ ডলারে উঠেছে। এর আগের দিন দাম বেড়েছিল ২.৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দামও সোমবার ৯০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। মঙ্গলবার সর্বশেষ প্রতি ব্যারেলের দাম ছিল ৯০.৮৬ ডলার।
হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় সামনে জ্বালানি পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।