একটি সংবাদমাধ্যমের মূল শক্তি হলো তার বস্তুনিষ্ঠতা এবং স্বচ্ছতা। নিজের প্রতিষ্ঠানের যেকোনো পরিস্থিতির সত্যতা পাঠকের কাছে প্রকাশ করাকে আমি একটি পরম নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করি।
আজ ‘স্রোত২৪.কম’-এর প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে আমি কোনো চাতুর্য বা লুকোচুরি না করে, অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় আমাদের বর্তমান বাস্তব চিত্রটি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।
আমার দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং এক কঠিন বাস্তবতা
দীর্ঘ দেড় দশকের সাংবাদিকতা ও সম্পাদনার জীবনে আমি বহু প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর শ্রমিক অসন্তোষের খবর প্রকাশ করেছি। অন্যের ত্রুটি বা বকেয়া বেতনের সংবাদ ছাঁপানো যতটা সহজ, নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করা ঠিক ততটাই কঠিন।
আজ নিয়তির এক অদ্ভুত পরিহাসে আমার নিজের গড়া প্রতিষ্ঠানই এক সাময়িক সংকটের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক সময়ে নানাবিধ অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয় এবং তীব্র অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে আমাদের অনলাইন পোর্টালটি সাময়িকভাবে আর্থিক সংকটে পড়েছে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমার সেইসব প্রিয় সহকর্মীদের ওপর, যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ‘স্রোত২৪.কম’ প্রতিদিন পাঠকদের কাছে সর্বশেষ সংবাদ পৌঁছে দেয়।
সদ্য সমাপ্ত পবিত্র ঈদের আনন্দের মুহূর্তে, এই অর্থসংকটের কারণে আমার সাতজন সংবাদকর্মীর বেতন আংশিক বকেয়া রয়ে গেছে। যথাসময়ে তাঁদের এই পাওনা সম্পূর্ণ পরিশোধ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ঈদে তাঁদের পাওনা পূর্ণাঙ্গভাবে দিতে না পারাটা আমার প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং এক বিশাল ব্যর্থতা।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের জন্য আমি তাঁদের কাছে এবং তাঁদের পরিবারের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। কোনো কর্পোরেট অজুহাত বা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এই বাস্তবতাকে আড়াল করার সস্তা চেষ্টা আমি করব না। সহকর্মীদের এই বকেয়া বেতনকে আমি এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও ঋণ হিসেবে গণ্য করছি।
কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের চরণে আমার আত্মশুদ্ধি
আমি সবসময় বিশ্বাস করি, ‘স্রোত২৪.কম’ শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধেই কথা বলবে না, প্রয়োজনে নিজের ত্রুটির বিপক্ষেও দাঁড়াবে। আমার জীবনদশায় অত্যন্ত প্রিয় কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ লিখেছিলেন, “আমি নিরপেক্ষ না, এই পক্ষে বা ওই পক্ষেও না, আমি সবার বিপক্ষে।”
তাঁর এই অমোঘ কবিতার লাইনের মতো করে আজ আমি বলতে চাই, 'আমি আমার নিজেরও বিপক্ষে।'
তাই নিজের প্রতিষ্ঠানের ভেতরের এই সংকটকে আড়াল না করে তা প্রকাশ্যে স্বীকার করাকেই আমি একমাত্র সঠিক সিদ্ধান্ত মনে করেছি। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও আমার সহকর্মীরা যেভাবে অসীম ধৈর্য ধরেছেন এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁদের সেই ত্যাগের প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
আমি আমাদের পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমাদের এই সংকটটি সাময়িক। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চলছে।
এক নতুন ভোরের প্রত্যাশায়
আজকের এই আত্মশুদ্ধি ও স্বচ্ছতা আমাদের পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ীদের মাঝে ‘স্রোত২৪.কম’-এর বিশ্বাসযোগ্যতা আরও দৃঢ় করবে বলে আমার বিশ্বাস। গণমাধ্যমের অর্থনৈতিক সংকট বর্তমান সময়ে নতুন কিছু নয়, তবে সেই সংকটকে সাহসের সাথে স্বীকার করে মোকাবিলা করাই প্রকৃত পেশাদারিত্ব। লুকোচুরি না করে সত্যকে মেনে নেওয়ার এই সাহসই আমাদের শক্তি।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সহকর্মীদের এই ত্যাগ বৃথা যাবে না। আমরা খুব দ্রুতই এই সাময়িক অন্ধকার কাটিয়ে উঠব এবং পূর্ণ শক্তিতে আমাদের বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার যাত্রা অব্যাহত রাখব।