রবিবার দুপুর ১২টার দিকে বিশ্বসংগীতের একটি বর্ণিল অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
বিষাদে ডুবেছে সুরের ভুবন
গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্তও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকেই হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে আশা ভোঁসলের অসুস্থতার খবর। প্রাথমিকভাবে গুঞ্জন উঠেছিল তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে উৎকণ্ঠা কাটিয়ে তাঁর নাতনি জানাই ভোঁসলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছিলেন, হৃদ্রোগ নয়, বরং ‘চরম ক্লান্তি এবং বুকে সংক্রমণ’-এর কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে আজ দুপুরে না ফেরার দেশে চলে গেলেন সুরের এই জাদুকরী।
সংগীতের এই মহীরুহের প্রয়াণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সংগীত অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। হাসপাতালের বাইরে এখন অনুরাগী ও সংবাদমাধ্যমের উপচেপড়া ভিড়।
মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা থাকলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর মনের জোর ছিল অটুট।
সাত দশকের সুরেলা সফর
আশা ভোঁসলে কেবল একজন গায়িকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার এক অনন্য উদাহরণ। ১৯৪৩ সালে দশ বছর বয়সে মারাঠি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর যাত্রা। বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের ছায়ায় হারিয়ে না গিয়ে তিনি নিজের জন্য এক স্বতন্ত্র পথ তৈরি করেছিলেন। ক্যাবারে, গজল, পপ থেকে শুরু করে ক্ল্যাসিকাল—সবক্ষেত্রেই তাঁর কণ্ঠ ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
হাজার হাজার গানে কণ্ঠ দিয়ে তিনি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নিজের নাম লিখিয়েছিলেন। বিশেষ করে রাহুল দেব বর্মণের (আর ডি বর্মণ) সঙ্গে তাঁর জুটি ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের ধারা বদলে দিয়েছিল। 'দম মারো দম' থেকে শুরু করে 'চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে' কিংবা 'দিল চিজ কেয়া হ্যায়'—প্রতিটি গানেই তিনি ঢেলে দিয়েছিলেন তাঁর প্রাণের স্পন্দন।
আশা ভোঁসলে: একনজরে বর্ণাঢ্য জীবন
জন্ম: ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ (সাঙ্গলি, মহারাষ্ট্র)।
সংগীত জীবন: সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে প্লেব্যাক ও অ্যালবাম।
ভাষার বৈচিত্র্য: বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, উর্দুসহ ২০টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়েছেন।
পুরস্কার: একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট এবং দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত।
বাংলাদেশ সংযোগ: অসংখ্য কালজয়ী বাংলা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি, যা এ দেশের মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
বাংলা গানে তাঁর অমলিন পদচিহ্ন
আশা ভোঁসলের কণ্ঠে বাংলা গান শুনলে মনেই হতো না তিনি অবঙালি। মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কিংবা নচিকেতা ঘোষের সুরে তাঁর গাওয়া 'আজ দুজনে মন্দ হলে কী হয়', 'আমি খাতার পাতায় লিখেছি', কিংবা 'চোখে চোখে কথা বলো' আজও বাঙালির মননে সতেজ। তাঁর গায়কীর সাবলীলতা এবং রোমান্টিকতা বাংলা আধুনিক গানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। ঢাকা ও কলকাতার শ্রোতাদের কাছে তিনি ছিলেন ঘরের মানুষ।
আশা ভোঁসলের মৃত্যু মানে কেবল একজন মানুষের চলে যাওয়া নয়, এটি একটি আস্ত সংগীত ঘরানার নিঃশব্দ বিদায়। তিনি শিখিয়েছিলেন কীভাবে সময়ের সঙ্গে নিজেকে আধুনিক রাখা যায়। ৯২ বছর বয়সেও তাঁরুণ্যের সেই সজীবতা তিনি ধরে রেখেছিলেন নিজের কণ্ঠে।
আজ সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। মুম্বাইয়ের বাসভবনে তাঁর মরদেহ রাখা হবে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। সুরের এই জাদুকরী আর নতুন কোনো গান উপহার দেবেন না ঠিকই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া হাজারো গানের সুরের মায়ায় তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।