পৃথিবীর বেশিরভাগ স্থানে দিন-রাতের স্বাভাবিক চক্র থাকলেও উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি কিছু দেশে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে রাত নামেই না। এই বিরল প্রাকৃতিক ঘটনাটি মূলত পৃথিবীর অক্ষীয় ঝোঁক ও সূর্যের অবস্থানের কারণে ঘটে, যা সৃষ্টি করে ‘মিডনাইট সান’-এর বিস্ময়কর দৃশ্য।
আমরা সাধারণত জানি, পৃথিবীতে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১২ ঘণ্টা দিন এবং ১২ ঘণ্টা রাত থাকে। তবে এই পরিচিত বাস্তবতা সর্বত্র প্রযোজ্য নয়। পৃথিবীর কিছু অঞ্চল, বিশেষ করে আর্কটিক ও অ্যান্টার্কটিক বৃত্তের ভেতরের দেশগুলোতে বছরের নির্দিষ্ট সময় এমন আসে, যখন সূর্য অস্তই যায় না।
এই ঘটনাকে বলা হয় “মিডনাইট সান” বা মধ্যরাতের সূর্য। এটি ঘটে মূলত পৃথিবীর অক্ষীয় ঝোঁকের (axial tilt) কারণে। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরার সময় প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি কাত হয়ে থাকে। ফলে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে। তখন ওই অঞ্চলে সূর্য দিগন্তের নিচে নেমে যায় না, ফলে টানা দিন চলতে থাকে।
উদাহরণ হিসেবে নরওয়ের কথা বলা যায়। ইউরোপের এই দেশটির উত্তরাঞ্চল আর্কটিক বৃত্তের মধ্যে পড়েছে। সেখানে মে মাসের শেষ থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত সূর্য অস্ত যায় না। ফলে রাতের অন্ধকার দেখা যায় না, দিনের আলোতেই কাটে ২৪ ঘণ্টা। এই সময়টিকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় “পোলার ডে”।
একই ধরনের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় সুইডেন, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং কানাডার কিছু অঞ্চলেও। আলাস্কার বারো শহরেও (Barrow, Alaska) গ্রীষ্মকালে প্রায় ৮০ দিনের বেশি সময় ধরে সূর্য অস্ত যায় না। বিপরীতে, শীতকালে এসব অঞ্চলে ঘটে ঠিক উল্টো ঘটনা, টানা অন্ধকার, যাকে বলা হয় “পোলার নাইট”।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দীর্ঘ দিন বা রাতের প্রভাব স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায়ও পড়ে। দীর্ঘদিন সূর্যের আলো থাকায় মানুষ বেশি সময় কাজ করতে পারে, পর্যটন বাড়ে, তবে ঘুমের সমস্যা বা জৈব ঘড়ির (biological clock) অসামঞ্জস্যও দেখা দেয়। আবার দীর্ঘ রাতের সময় মানসিক অবসাদ বা “সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার” (SAD)-এর মতো সমস্যাও বাড়তে পারে।
তবে এই ব্যতিক্রমী প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ শুধু এই মধ্যরাতের সূর্য দেখার জন্য নরওয়ে বা আইসল্যান্ডে ভিড় জমান। রাত ১২টায় সূর্য আকাশে ঝলমল করছে, এমন দৃশ্য সত্যিই বিরল এবং বিস্ময়কর।
একনজরে জেনে নিন:
দিন-রাতের চক্র আমাদের কাছে যতটা স্বাভাবিক, পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করে। ‘মিডনাইট সান’ শুধু একটি বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়, এটি প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময়, যা আমাদের গ্রহের বৈচিত্র্য ও জটিলতার আরেকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরে।