পুরোনো বা পরিত্যক্ত ভবনে প্রবেশ করলে হঠাৎ অস্বস্তি, বুক ধড়ফড় বা অকারণ ভয়, এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। এতদিন এসব অনুভূতির পেছনে অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যাই বেশি শোনা গেলেও নতুন এক গবেষণা বলছে, মানুষের কানে শোনা যায় না এমন নিম্ন-কম্পাঙ্কের শব্দ বা ‘ইনফ্রাসাউন্ড’ই হয়তো এই অদ্ভুত অনুভূতির মূল কারণ।
আচরণগত স্নায়ুবিজ্ঞানবিষয়ক একটি সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০ হার্টজের নিচের শব্দতরঙ্গ মানুষের কানে ধরা পড়ে না। কিন্তু এই কম্পন দেয়াল, মেঝে ও ধাতব কাঠামোর ভেতর দিয়ে সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। গবেষকদের মতে, মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ক এই অদৃশ্য কম্পনের প্রতি সংবেদনশীল হওয়ায় তা অস্বস্তি, ভয় কিংবা চাপের অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইনফ্রাসাউন্ড নতুন কোনো ধারণা নয়। বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা জানেন, ঝড়, ভূমিকম্প, সমুদ্রের ঢেউ কিংবা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকেও এ ধরনের কম্পন সৃষ্টি হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের তৈরি বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও একই ধরনের শব্দ উৎপন্ন করতে পারে। বিশেষ করে পুরোনো পাইপলাইন, বায়ু চলাচলের যন্ত্র, বড় শিল্পকারখানার মোটর কিংবা জীর্ণ বৈদ্যুতিক কাঠামো থেকে দীর্ঘসময় ধরে নিম্ন-কম্পাঙ্কের কম্পন তৈরি হতে পারে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবককে এমন কক্ষে রাখা হয়, যেখানে কৃত্রিমভাবে খুব কম কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করা হয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের অনেকে সেখানে অস্বস্তি, উদ্বেগ, শরীর ভারী লাগা এবং “কেউ যেন তাকিয়ে আছে” ধরনের অনুভূতির কথা জানান। অথচ তারা কেউই কোনো শব্দ শুনতে পাননি। গবেষকদের দাবি, এই ফলাফল মানুষের ভয় ও পরিবেশগত অনুভূতির সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের মস্তিষ্ক সব সময় আশপাশের পরিবেশ বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তার সংকেত খোঁজে। যখন অদৃশ্য কোনো কম্পন শরীরে চাপ তৈরি করে, তখন মস্তিষ্ক সেটিকে অজানা বিপদ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে। বিশেষ করে আলো কম, নির্জন বা ভগ্নপ্রায় পরিবেশে এই অনুভূতি আরও তীব্র হয়। ফলে মানুষ সহজেই অতিপ্রাকৃত উপস্থিতির ধারণায় প্রভাবিত হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা আরও মনে করেন, বহু “ভৌতিক” স্থানের অভিজ্ঞতার পেছনেও ইনফ্রাসাউন্ড ভূমিকা রাখতে পারে। অতীতে কিছু পুরোনো থিয়েটার, দুর্গ ও পরিত্যক্ত ভবনে অস্বাভাবিক শব্দকম্পনের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল। সেখানে অবস্থান করা ব্যক্তিদের মধ্যে একই ধরনের অস্বস্তি ও আতঙ্কের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, সব ধরনের ভয় বা অস্বস্তির কারণ ইনফ্রাসাউন্ড নয়। ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, পরিবেশ, পূর্বধারণা ও সামাজিক বিশ্বাসও এ ধরনের অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। তাই বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত না করে বৈজ্ঞানিকভাবে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।