চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে ১৭৯৬ সাল এক অবিস্মরণীয় বছর। এই বছরই ইংরেজ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার প্রথমবারের মতো সফলভাবে গুটিবসন্তের টিকা প্রয়োগ করেন। মানবসভ্যতাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী আতঙ্কে রাখা প্রাণঘাতী রোগ গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে এটাই ছিল বিশ্বের প্রথম কার্যকর টিকাদান, যা পরবর্তীতে আধুনিক ভ্যাকসিন ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে দেয়।
অষ্টাদশ শতকে গুটিবসন্ত ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর সংক্রামক রোগগুলোর একটি। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকাজুড়ে লাখ লাখ মানুষ এই রোগে মারা যেত। আক্রান্তদের শরীরে ভয়াবহ ফুসকুড়ি, জ্বর এবং স্থায়ী দাগ তৈরি হতো। অনেকেই দৃষ্টিশক্তি হারাতেন। সে সময় চিকিৎসাবিজ্ঞানে কার্যকর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে নতুন এক ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন এডওয়ার্ড জেনার। তিনি লক্ষ্য করেন, যারা গরুর বসন্ত বা কাউপক্সে আক্রান্ত হন, তারা পরে আর গুটিবসন্তে আক্রান্ত হন না। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই জন্ম নেয় টিকাদানের ধারণা।
১৭৯৬ সালের ১৪ মে জেনার এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা পরিচালনা করেন। কাউপক্সে আক্রান্ত এক দুধ বিক্রেতা নারীর হাতের ক্ষত থেকে নমুনা নিয়ে তিনি আট বছর বয়সী জেমস ফিপস নামের এক শিশুর শরীরে প্রয়োগ করেন। পরে ওই শিশুকে গুটিবসন্তের সংস্পর্শে আনা হলেও সে অসুস্থ হয়নি। এতে প্রমাণিত হয়, কাউপক্সের মাধ্যমে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব।
এই আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন যুগের সূচনা করে। “ভ্যাকসিন” শব্দটিও এসেছে ল্যাটিন শব্দ “ভাক্কা” থেকে, যার অর্থ গরু। কারণ, জেনারের টিকার মূল ধারণাই ছিল গরুর বসন্তকে ব্যবহার করে গুটিবসন্ত প্রতিরোধ করা।
পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টিকাদান কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে। বহু গবেষণা ও উন্নয়নের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় আধুনিক ভ্যাকসিন প্রযুক্তি। হাম, পোলিও, জলাতঙ্ক, হেপাটাইটিসসহ অসংখ্য প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধে টিকা আজ সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৮০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়, পৃথিবী থেকে গুটিবসন্ত সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে। ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো মানবসংক্রামক রোগ, যা টিকাদানের মাধ্যমে বিশ্ব থেকে নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে।
দুই শতাব্দীরও বেশি সময় আগে এডওয়ার্ড জেনারের সেই সাহসী উদ্যোগ আজও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় বিপ্লবগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। আধুনিক বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষার পেছনে রয়েছে ১৭৯৬ সালের সেই ছোট্ট কিন্তু যুগান্তকারী পরীক্ষা।