দুই বছর আগে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতনের ঘটনা ছিল না; এটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, জবাবদিহি, গণতন্ত্র এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ, সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে।
তবে দুই বছর পর প্রশ্ন উঠেছে, গণঅভ্যুত্থানের মূল প্রত্যাশাগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? কোথায় এসেছে পরিবর্তন, কোথায় রয়ে গেছে পুরোনো সংকট, আর ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জই বা কী?
যেসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন
গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন, স্থানীয় সরকার ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। পরে এসব সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের রূপরেখা সামনে আসে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ সময় পর নতুন নেতৃত্বের অধীনে সরকার গঠিত হয়েছে এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তিরও উত্থান ঘটেছে। একই সঙ্গে অতীতের বিভিন্ন ঘটনার বিচার ও জবাবদিহির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
যে প্রত্যাশাগুলো এখনো অপূর্ণ
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কিছু পরিবর্তন এলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনেক সংকট এখনো রয়ে গেছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কমেনি। নিত্যপণ্যের দাম, জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে সরকার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে সংস্কার নিয়ে আলোচনা চলছে, তবে এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পুরোপুরি পৌঁছাতে সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিচারপ্রক্রিয়ার গতি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়েও নানা মহলে প্রশ্ন রয়েছে। অনেকের মতে, কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারই হবে গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
যে প্রত্যাশাগুলো এখনো অপূর্ণ
নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকদের মতে, দুই বছরে আরও কিছু বিষয়ে দ্রুত অগ্রগতি হলে গণঅভ্যুত্থানের অর্জন আরও শক্ত ভিত্তি পেত।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন হবে তখনই, যখন ব্যক্তি বা দলনির্ভর রাজনীতির পরিবর্তে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে আইনের শাসন, স্বচ্ছ নির্বাচন, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও মনে করছেন, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক অগ্রগতি নির্ভর করবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, বেসামরিক শাসনের শক্তিশালীকরণ এবং রাজনৈতিক সংস্কারের ধারাবাহিকতার ওপর।
ভবিষ্যতের বাংলাদেশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন এসেছে, তবে সংস্কারের যাত্রা এখনো অসম্পূর্ণ। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের ওপর নয়, বরং এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার ওপর যেখানে জবাবদিহি, সুশাসন ও নাগরিক অধিকার দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত হবে।