অফিসের ব্যস্ততা কিংবা ক্যাফেতে বন্ধুদের আড্ডা—চা পরিবেশনের সময় এখন প্রায়ই একটি কথা শোনা যায়, ‘আমার চায়ে কিন্তু চিনি দেবেন না!’ এমন কথা শুনলে অনেকেই ভাবেন তিনি হয়তো ভীষণ স্বাস্থ্যসচেতন, আবার অনেকে ঠাট্টা করে বলেন ট্রেন্ড অনুসরণ করার কথা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে বর্তমানে ‘নো সুগার টি’ বা চিনি ছাড়া চা পান যেন এক আধুনিক জীবনধারার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এটি কি শুধুই সাময়িক এক ট্রেন্ড, নাকি এর পেছনে বৈজ্ঞানিক সুফলও রয়েছে?
পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, চায়ের চিনি বাদ দেওয়া অবশ্যই এক ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে তা পুরো খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভর করে। সারাদিন অন্যান্য মিষ্টি, কোমল পানীয় বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খেয়ে কেবল চায়ের চিনি বাদ দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, দৈনিক মোট ক্যালোরির ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি অতিরিক্ত চিনি বা 'ফ্রি সুগার' গ্রহণ করা উচিত নয়, যা প্রায় ২৫ গ্রাম বা ৬ চা-চামচের সমান। সাধারণ এক কাপ চায়ে ১-২ চা-চামচ চিনি থাকে; ফলে দিনে একাধিক কাপ মিষ্টি চা খেলে অজান্তেই শরীরে বিপুল পরিমাণ চিনি প্রবেশ করে। দীর্ঘমেয়াদে যা ওজন বৃদ্ধি, দাঁতের ক্ষয় ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
তবে অনেকেই মনে করেন, চা বা খাবারে চিনি না খেলেই ডায়াবেটিস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা সম্ভব—যা একটি ভুল ধারণা। মুম্বাইয়ের এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডা. শেহলা শেখ জানান, ডায়াবেটিস কেবল চিনি খাওয়ার ওপর নির্ভর করে না। এটি মানসিক চাপ, ঘুমের অভ্যাসে অনিয়ম, কায়িক পরিশ্রমের অভাব এবং সার্বিক খাদ্যাভ্যাসের যৌথ প্রভাবের ফল। তাই চায়ে চিনি না খেলেই ডায়াবেটিস হবে না—এমন ভাবা সঠিক নয়, তবে এটি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।
এছাড়া চিনির বিকল্প হিসেবে কৃত্রিম মিষ্টি বা ‘নন-সুগার সুইটনার’ ব্যবহার নিয়েও সতর্ক করেছে হু (WHO)। সংস্থাটির মতে, কেবল ওজন কমাতে কৃত্রিম মিষ্টি ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে সুফল নাও দিতে পারে। বরং ধীরে ধীরে কম মিষ্টির স্বাদে নিজেকে অভ্যস্ত করে তোলাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। শুরুতে চিনি ছাড়া চা কিছুটা তেতো লাগলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জিহ্বা এই স্বাদে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং চায়ের প্রকৃত সুবাস উপভোগ করা সম্ভব হয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, চায়ে চিনি না খাওয়াকে স্রেফ একটি ফ্যাশন হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এটি কেবল তখনই কার্যকর স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে পরিণত হবে, যখন একজন মানুষ সার্বিকভাবে সুষম ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলবেন।