সকাল সাড়ে আটটা। মিরপুরের বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী রাইহান আহমেদ অফিসের জন্য বের হয়েই পকেটে হাত দিলেন। তবে মানিব্যাগ নয়, বের করলেন স্মার্টফোন। স্ক্রিনে কয়েকটা ট্যাপ করতেই হাজির এক মোটরবাইক চালক। যানজটের শহর ঢাকাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আধঘণ্টার মধ্যেই রাইহান পৌঁছে গেলেন কারওয়ান বাজারে তাঁর অফিসে।
ঠিক একই সময়ে, চকবাজারের ক্ষুদ্র প্লাস্টিক ব্যবসায়ী কামরুল হাসান তাঁর দোকানে বসে ভাবছিলেন কীভাবে এক টন কাঁচামাল সাভারের কারখানায় পাঠাবেন। আগে হলে তাঁকে দোকান বন্ধ করে ট্রাক স্ট্যান্ডে গিয়ে দরাদরি করতে হতো। কিন্তু কামরুল সাহেব এখন আর দোকান ছাড়েন না। পকেট থেকে ফোন বের করে ‘ট্রাক লাগবে’ অ্যাপে ট্রিপ পোস্ট করলেন। ১০ মিনিটের মধ্যে চালকের সঙ্গে ভাড়া চূড়ান্ত হয়ে গেল, আর এক ঘণ্টার মধ্যে পিকআপ এসে মাল নিয়ে রওনা দিল।
এটি কোনো কাল্পনিক দৃশ্য নয়; বর্তমান বাংলাদেশের চিরচেনা প্রতিদিনের চিত্র। উবার, পাঠাও, সহজ, লালামুভ কিংবা ট্রাক লাগবে-র মতো বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের যাতায়াত আর পণ্য পরিবহনের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এক ক্লিকেই এখন মানুষ ছুটছে গন্তব্যে, আর এক ক্লিকেই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে টন টন পণ্য।
রাইড শেয়ারিং: যানজটের শহরে স্বস্তির নিশ্বাস
বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিংয়ের গল্পটা শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালের দিকে। উবার আর পাঠাও-এর হাত ধরে শহরবাসী প্রথম জানতে পারে যে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিএনজি বা বাসের জন্য অপেক্ষা না করেও যাতায়াত করা সম্ভব।
আজ ২০২৬ সালে এসে এই সেবা কেবল ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো মেগাসিটিতে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরেও। উবার যেখানে চার চাকার গাড়ি বা ইন্টারসিটি ট্রিপ দিয়ে দূরপাল্লার যাতায়াত সহজ করেছে, সেখানে পাঠাও, সহজ-এর মতো অ্যাপগুলো মোটরবাইক সেবার মাধ্যমে দেশের তরুণ ও মধ্যবিত্ত কর্মজীবীদের প্রতিদিনের কর্মঘণ্টা বাঁচিয়ে দিচ্ছে। জিপিএস ম্যাপ আর ফিক্সড ভাড়ার কল্যাণে ‘যাব না’ কিংবা ‘অতিরিক্ত ভাড়া’র চিরাচরিত ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেয়েছে সাধারণ মানুষ।
পার্সেল থেকে লজিস্টিকস: ঘরে বসেই ব্যবসার প্রসার
করোনা মহামারীর পর থেকে দেশে ই-কমার্স এবং ফেসবুক-ভিত্তিক এফ-কমার্সের এক বিশাল জোয়ার এসেছে। আর এই জোয়ারকে সফল করতে ব্যাকবোন বা মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে অ্যাপ-ভিত্তিক লজিস্টিকস সেবা।
ধরা যাক, একজন গৃহিণী ঘরে বসে কেক বা শাড়ি বিক্রি করেন। তাঁর তৈরি পণ্যটি কাস্টমারের কাছে নিরাপদে পৌঁছানোর দায়িত্ব এখন ‘পাঠাও পার্সেল’ বা ‘সহজ’-এর মতো অন-ডিমান্ড ডেলিভারি সার্ভিসের। শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যেকোনো ছোট পার্সেল, জরুরি নথিপত্র কিংবা খাবার পৌঁছে যাচ্ছে ঘরে ঘরে।
লালামুভ ও ট্রাক লাগবে: পণ্য পরিবহনের ‘ডিজিটাল বিপ্লব’
ভারী মালামাল বা বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে একসময় দালালচক্র এবং ট্রাক স্ট্যান্ডের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি থাকতে হতো সাধারণ মানুষকে। বাসা বদল বা ব্যবসার কাঁচামাল আনা-নেওয়ার কথা ভাবলেই কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ত। এই কঠিন সমীকরণটিকে সহজ করে দিয়েছে হংকং ভিত্তিক আন্তর্জাতিক চেইন ‘লালামুভ’ এবং দেশীয় স্টার্টআপ ‘ট্রাক লাগবে’।
লালামুভ (Lalamove): ছোট ও মাঝারি পণ্য বা লাইট কমার্শিয়াল মুভমেন্টের জন্য এটি এখন দারুণ জনপ্রিয়। মোটরবাইক থেকে শুরু করে ছোট ভ্যান বা ১ টনের ট্রাক, সবই মিলছে এক অ্যাপে। লাইভ ট্র্যাকিং সুবিধার কারণে ক্রেতা নিজেই দেখতে পারেন তাঁর মূল্যবান মালামাল এখন ঠিক কোন রাস্তায় আছে।
ট্রাক লাগবে (Truck Lagbe): ভারী পণ্য পরিবহনের এক অনন্য ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে যেকোনো সাইজের ট্রাক, পিকআপ বা কাভার্ড ভ্যান বুক করা যায় মুহূর্তেই। ওপেন বিডিং বা ডিরেক্ট কলিংয়ের মাধ্যমে চালক ও গ্রাহক সরাসরি যুক্ত হতে পারছেন। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমেছে আর সঠিক ভাড়ায় পণ্য পরিবহন নিশ্চিত হচ্ছে।
অর্থনীতির নতুন লাইফলাইন ও কর্মসংস্থান
এই অ্যাপ-ভিত্তিক সেবাগুলো কেবল মানুষের জীবনযাত্রাই সহজ করেনি, দেশের অর্থনীতিতে এক বিশাল অবদান রাখছে। লাখ লাখ যুবকের জন্য এটি তৈরি করেছে সম্মানজনক কর্মসংস্থান। পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম বা ফুল-টাইম রাইডার হিসেবে কাজ করে হাজারো তরুণ স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
অন্যদিকে, হাজার হাজার ট্রাক চালক এখন স্ট্যান্ডে অলস বসে না থেকে অ্যাপের মাধ্যমে নিয়মিত ট্রিপ পাচ্ছেন, যা তাঁদের আয় বাড়াতে সাহায্য করছে।
পাশাপাশি, ক্যাশলেস ইকোনমি বা ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রেও এটি বড় ভূমিকা রাখছে। বিকাশ, নগদ বা ব্যাংকিং কার্ডের মাধ্যমে ভাড়া পরিশোধের সুবিধা থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ ও আধুনিক হয়ে উঠেছে।
চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে সম্ভাবনার পথে
প্রযুক্তির হাত ধরে বাংলাদেশ আজ যেভাবে লজিস্টিকস ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। রাইডারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ট্রাফিক নিয়মের সঠিক প্রতিপালন এবং চালকদের প্রশিক্ষণের মতো কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে। তবে সব চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে, এই বেসরকারি সংস্থাগুলোর তৈরি করা ডিজিটাল ইকোসিস্টেম আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে, বাংলাদেশ এখন গতির পথে, প্রগতির পথে।